লা বারে: ধর্মের কারণে বলি হওয়া এক দুঃখী নাইট

(লেখাটি লিখেছেন সুমিত রায়। লেখাটি গুরুত্বপূর্ণ মনে করায় নিজের ব্লগে টুকে রাখলাম)

ফ্রান্সে একটা সময় ছিল যখন ধর্মীয় কোন কিছুতে ঠিক মত আচরণ না করা বা টুপি খুলে সম্ভাষণ না করা ছিল জঘন্যতম অপরাধ, আর এই অপরাধের শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। ১৭৬৬ সালে শেভালিয়ার ডে লা বারেকে একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রার প্রতি টুপি খুলে সম্ভাষণ না জানানোর কারণে হত্যা করে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হয়। তার মৃত্যুর এতদিন পরেও এখনও ফ্রান্সের সেক্যুলারিস্ট ও ক্যাথলিকগণ লা বারে এর এই দুর্ভাগ্যের ব্যাপারে তর্ক করে চলেছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্সের মারশাল ফিলিপ পেটেইনকে জার্মান জেনারেলদের ব্রোঞ্জের চাহিদা পূরণের জন্য প্যারিসের মূর্তিগুলো তাপ দিয়ে বিগলিত করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। তো যখন কোন কোন মূর্তিকে গলানো হবে তা নির্ধারণ করার সময় এল তখন মারশাল খুব সতর্কতার সাথেই মূর্তিগুলোকে নির্বাচন করলেন। আর এই মূর্তিগুলোকে নির্বাচন করার সময় তিনি বেঁছে নিলেন শাভেলিয়ের ডে লা বারে এর মূর্তি যা বহুদিন ধরে প্যারিসের স্যাক্রে-ক্যুর বাসিলিকা চার্চের চোখের বালি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আর হলও তাই।

কয়েক দশক ধরে মূর্তিটির বেদি খালি পড়েছিল। কিন্তু তবুও সেই বেদিতে একটা লেখা খোদাই করে লেখা ছিল- “শেভালিয়ার ডে লা বারে এর প্রতি উৎসর্গ করে, যাকে ধর্মীয় শোভাযাত্রার প্রতি সম্ভাষণ না জানানোর কারণে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়”। ডে লা বারেকে ফ্রান্সের লোকজন নাইট বলেও ডাকে। আর এই দুঃখী নাইটের দুর্ভাগ্য তার জীবদ্দশাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মৃত্যুর অনেক বছর পর তার মূর্তিকে হনন করে বেদিশূন্য করাটা বোধ হয় এই দুঃখী নাইটের চির-দুর্ভাগ্যেরই একটি অংশ ছিল। আর তার সেই দুর্ভাগ্যের সূচনা ঘটেছিল মাত্র উনিশ বছর বয়সে, অষ্টাদশ শতকে।

১৭৬৫ সালের অগাস্ট মাসে ফ্রেঞ্চ টাউন আবেভিলেতে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। শহরের কাঠের ক্রুসিফিক্সে কাঁটা দাগ দেখা যাচ্ছে আর এটাকে কিনা কেউ খেয়ালই করল না! François-Jean Lefèvre , Chevalier de la barre, Voyou de qualité বইটির লেখক ক্রিশ্চিয়ান পিতর বলেন, “ক্রুসিফিক্স এর ক্ষত লক্ষ্য করার পর যাজকরা এমন আচরণ করা শুরু করেন যেন স্বয়ং ঈশ্বরকেই আক্রমণ করা হয়েছে”।

লা বারের জন্ম ১৭৪৫ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর। তখন লা বারের বয়স মাত্র উনিশ বছর ছিল। সে একজন নোবেলম্যান বা অভিজাত বংশের ছেলে ছিল কিন্তু সাথে কোন টাকাপয়সা ছিল না। ছেলেটি কান্ট্রিসাইডে ঘুরে বেড়াত এবং বিভিন্ন সরাইখানায় ফুর্তি করে বেড়াত। পিতর বলেন, “সে ছিল একট মুক্ত বিহঙ্গের মত স্বাধীনচেতা। অন্য বিষয়ে তার কোন ধারণা ছিলনা, কোন ধর্মমতেই সে বিশ্বাস করত না”।

কিন্তু তার এই স্বাধীনতা খুব বেশিদিন স্থায়ী হল না। ক্রুসিফিক্স এর ক্ষত আবিষ্কৃত হবার পর একজন স্থানীয় বিচারক এই পবিত্র বস্তুকে কে অবজ্ঞা করেছে তাকে খুঁজে বের করার জন্য তদন্ত শুরু করতে নির্দেশ করেন। কিন্তু এই তদন্তে কিছুই পাওয়া গেল না। কেউই কোন কিছু দেখেনি বা শোনেনি। কিন্তু আকারে ইঙ্গিতে স্থানীয়রা শহরের কিছু তরুনকে সন্দেহ করছিল। কেউ কিছু না দেখলেও কয়েকজন লোক কিছু তরুন বখাটের কথা ঠিকই মনে রেখেছে যারা শোভাযাত্রা চলাকালিন সময়ে টুপি খুলে সম্ভাষণ জানায় নি। তিনটা নাম বেরিয়ে এল: গাইলার্ড ডি এটালন্ডে, জিন ফ্রানকোইস ডে লা বারে এবং মইসনেল।

অবস্থা খারাপ বুঝে গিলার্ড ডি এটালন্ডে হল্যান্ডে পালিয়ে যায়।  লা বারে যায় না, পয়সা ছাড়া আর কোথায় বা যাবে? এছাড়া তার একটা এলিবাইও আছে। কিন্তু যখন তার আন্ট এর এবে তে তার ঘরে তল্লাশি চালানো হল তখন তিনটি নিষিদ্ধ বই পাওয়া গেল। এগুলোর মধ্যে যৌন আবেদনময় বই ছিল  যা দেখে নিঃসন্দেহে সবাই নাক শিটকেছিল। একটা তরুন বখাটের ঘরে এরকম বই থাকা অবাক হওয়ার মত কিছু না। কিন্তু যে জিনিসটা তদন্তকারীদেরকে চক্ষু ছানাবড়া করে দিয়েছিল তা কোন সাধারণ বখাটের ঘরে পাওয়া যায় না। তার ঘরে ছিল ভলতেয়ারের নিষিদ্ধ বই ডিকশনারে ফিলোসফিক (Dictionnaire Philosophique)। ব্যাস, একজন আদর্শ সন্দেহভাজন হতে গেলে এর চেয়ে ভাল আর কিই বা দরকার?

শেভালিয়ার ডে লা বারেকে ধর্মবিরুদ্ধ গান গাওয়া, ধার্মিকদের ছবিতে থুতু দেয়া, এবং ধর্মীয় শোভাযাত্রার প্রতি টুপি খুলে সম্মান প্রদর্শন না করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযোগ ছিল মূলত ঈশ্বরনিন্দা ও ধর্মদ্রোহিতার। পিতর বলেন, “লা বারে একজন স্থানীয় বখাটে তরুন হতে পারে, কিন্তু ধর্মবিরোধী সে ছিল না”। তিনি আরও বলেন, “ সকলে বলেছিল লা বারে অন্যদের দিকে থুতু দিত, সকলে বলেছিল লা বারে তরুনী নারীদের সাথে ফ্লার্ট করত, এরকম অনেক “সকলে বলেছিল” আছে… আসল সত্যটি হল তখনকার সমাজটি যেরকম ছিল, লা বারে তার সাথে মানানসই ছিল না”।

১৭৬৫ সালে ফরাসী রাজতন্ত্রের দুর্বলতা চোখে পড়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। আর এই দুর্বলতাই পরবর্তীতে ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সকে ফরাসী বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসে। যাই হোক, হিস্টোরিয়ান ম্যাক্স গ্যালো বলেন, তখনকার রাজা পঞ্চদশ লুই রাষ্ট্র পরিচালনার চাইতে শিকার ও তার স্ত্রী মাদাম ডে মেইলি, ডে ভিন্টিমিলে, ডে শাতোহ এর সাথে ব্যস্ত থাকতে বেশি পছন্দ করতেন। গ্যালো লিখেছেন, “রাজতন্ত্র তখন একটা বুনো জানোয়ারের মত ছিল যে সবসময়ই ঘুমিয়ে থাকে কিন্তু যেকোন সময় ভয়ানকভাবে জেগে উঠতে পারে আর যেকোন দ্রূতগামী কুকুরের মত হত্যা করতে পারে”। ব্লাসফেমি কেবল চার্চের প্রতিই অপমান ছিল না বরং এটা রাজতন্ত্র, যা ধর্মীয় মতাদর্শে চালিত হত তার বিরুদ্ধেও একটি বড় আঘাত ছিল।

লা বারে এর দুর্ভাগ্য ছিল যে সে থেনিয়ান রেজিম এর এরিস্টোক্রেসির সদস্য ছিল। সে এমন একজন নোবেলম্যান ছিল যে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারত এবং বিভিন্ন নিয়ম কানুন ভঙ্গ করতে পারত। রাজার মতো সেও একটা মৃতপ্রায় বংশের সদস্য ছিল। আর তাদের এই এতদিনের আভিজাত্য সময়ের সাথে সাথে ক্রমশ উন্নতি করা বুর্জোয়াদের দ্বারা প্রায় মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিল।

উচ্চ আসনে অনেক বন্ধু থাকা সত্ত্বেও না রাজতন্ত্র আর না প্যারিসের বিচারসভা লা বারেকে ছেড়ে দিয়েছিল। মইসনেলকে গ্রেফতার করা হলেও তার বয়স মাত্র ১৫ ছিল বলে তাকে অর্থদণ্ড দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু ডে লা বারেকে বাঁচানো যায় নি। প্যারিসের পারলামেন্ট তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।  ১৭৬৬ সালের ১ জুলাই লা বারেকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। তার পা দুটোকে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল এবং জিভ ছিড়ে ফেলা হয়েছিল।  তাকে শিরশ্ছেদ করা হয় এবং ভলটেয়ারের ডিকশনারে ফিলোসফিক বইটি তার শরীরে গেঁথে তাকে খুঁটিতে বেঁধে তাকে আগুনে পোড়ানো হয়।

ভলতেয়ার তাকে মুক্ত করার জন্য একটি ক্যামপেইন শুরু করেছিলেন এবং তার মামলাকে চার্চ ও ফ্রেঞ্চ জাজদের সমালোচনার জন্য ব্যবহার করেছিলেন। ১৭৬৬ সালের জুলাই এ তিনি তার “রিলেশন ডে লা মর্ট ডু শেভালিয়ার ডে লা বারে” রচনা করেন।

ফেডারেশন অব ফ্রেঞ্চ ফ্রি থট এর সেক্রেটারি জেনারেল ক্রিশ্চিয়ান এশ্চেন বলেন, “এর পরেই শেভালিয়ার ডে লা বারে “ধর্মীয় ও যাজকীয় নিপীরণের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকে পরিণত হয়”। যাই হোক, ফেডারেশন অব ফ্রেঞ্চ ফ্রি থট প্রতিষ্ঠানটি এখনও ফ্রান্সে চার্চ ও স্টেট এর সেপারেশনের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে। ডে লা বারে এর উদাহরণ তাদেরকে উৎসাহিত করছে।

পরবর্তীতে আবার দ্বিতীয় দফায় ডে লা বারের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু নতুন এই মূর্তিটিকে নাকি আগের মত লাগে না। নতুন মূর্তিটিকে নাকি অনেকটা নম্রভাবে তৈরি করা হয়েছে।

আজ ফ্রান্স সহ পশ্চিমের দেশগুলোর মুক্তমনারা তাদের জীবনের স্বাধীনতাকে উপভোগ করছেন কিন্তু আজও মুক্তমনারা তাদের বিশ্বাসের জন্য নির্যারিত হন এবং তাদেরকে হত্যা করা হয়। ১ জুলাই এ লা বারেকে হত্যা করা হয় বলে ফ্রান্সে এই দিনকে শেভালিয়ার ডে লা বারে দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়। এই দিনটি যাদেরকে ধর্মীয় কারণে হত্যা করা হয়েছে তাদেরকে স্মরণ করার জন্য এবং যাদের হত্যা করা হচ্ছে তাদের অধিকার আদায়ের লড়াই এর জন্য।

তথ্যসূত্র:

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Fran%C3%A7ois-Jean_de_la_Barre
  2. http://secularseasons.org/july/barre_day.html
  3. http://everything2.com/index.pl?node_id=1184120
  4. http://en.rfi.fr/visiting-france/20101216-french-free-thinking-knight-still-controversial-figure

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.